ঢাকা, ১৯ আগস্ট, ২০১৯ || ৩ ভাদ্র ১৪২৬
৭৮৯

বিমানের জিএসএ নিয়োগে দুর্নীতি

এভিয়েশন করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ৮ মে ২০১৬   আপডেট: ৯ মে ২০১৬


ঢাকা: বিমান বাহিনী এয়ার ভাইস মার্শালের তদন্তও আমলে নেয়নি বোর্ড বাংলাদেশ বিমানের চার আন্তর্জাতিক স্টেশনে জিএসএ নিয়োগ নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি ও বিপুল অংকের টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে জেদ্দার জিএসএ এলাফ এভিয়েশন ও মাস্কটের ওমান ট্রাভেল ব্যুরো নামে দুটি জিএসএ নিয়ে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

বিমানের সিনিয়র বোর্ড মেম্বার ও বিমান বাহিনীর বর্তমান এয়ার ভাইস মার্শাল, সহকারী চিফ অব এয়ার স্টাফ, (অপারেশন অ্যান্ড ট্রেনিং) এম নাইম হাসান ও সাবেক বোর্ড মেম্বার এসএম জাকারিয়ার পৃথক দুটি তদন্তে এলাফ এভিয়েশন ও এলাফ কার্গোর দুর্নীতি প্রমাণিত হয়। এছাড়া সাবেক সংসদীয় কমিটির একটি রিপোর্টে ওমানের জিএসএ ওমান ট্রাভেল ব্যুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব দুর্নীতির কারণে বিমানের গত পর্ষদের সর্বশেষ বোর্ড সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে পুরনো জিএসএ’র মেয়াদ নতুন করে না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জিএসএ বিমান বোর্ডের অধীনে রাখা ও মেয়াদ শেষের ৬ মাস আগে দরপত্র আহ্বান করারও সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্ত এলাফ এভিয়েশনকে ব্লাকলিস্ট করারও সিদ্ধান্ত হয়।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, মার্কেটিং বিভাগের একটি সিন্ডিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত গোপন করে বিমান বোর্ড সাব-কমিটিকে ম্যানেজ করে চার জিএসএ’র মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী জুন মাস এই ৪ জিএসএ’র মেয়াদ শেষ হবে। নিয়মানুযায়ী যে কোনো জিএসএ’র মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস আগে টেন্ডার করতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেট এখনও কোনো ধরনের টেন্ডার আহ্বান করেনি। এর মূল রহস্য হচ্ছে সময়ক্ষেপণ করা। সামনে হজ মৌসুম আসছে। এরপর হজের দোহাই দিয়ে এবং টেন্ডার আহ্বান করতে না পারার অজুহাত দেখিয়ে ৪ জিএসএকে ১ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়ার চক্রান্ত চলছে। অভিযোগ আছে, এ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে বোর্ড সাব-কমিটির চেয়ারম্যান এনআই খানের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিমান বোর্ড চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী, বোর্ড সাব-কমিটির সদস্য সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণি চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম খানকে বিষয়টি জানিয়ে মেইল করা হলেও তারা কেউ কোনো উত্তর দেননি। তারা কেউ ফোনও ধরেন না।
অভিযোগ আছে, সম্প্রতি বিমানের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক শাহনেওয়াজ ও জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ আহসান কাজীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পর পর দুই দফায় জেদ্দা গিয়ে এলাফ এভিয়েশনের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে। জেদ্দা অফিসের সাবেক স্টেশন ম্যানেজার আবু তাহের দু’পক্ষের মধ্যে মধ্যস্ততা করছেন।
সম্প্রতি বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও জিএসএস এলাফ এভিয়েশনের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে আবু তাহেরকে জেদ্দা স্টেশন থেকে টার্মিনেট করা হয়। এরপর বিমান পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে আবু তাহেরকে চাকরি থেকে বহিষ্কার, বিভাগীয় মামলা দায়ের ও চার্জশিট গঠন করে বিচার করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিমানের বর্তমান এমডি উইং কমান্ডার আসাদ্দুজ্জামানকে টেলিফোন করে তাহেরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য বলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ভয়ে এমডি তাহেরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে জানা গেছে। যদিও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, আবু তাহেরের বিষয়টি তিনি বিমান পরিচালনা পর্ষদে উত্তাপন করে সমাধান করতে বিমান এমডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাহেরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি কাউকে নিষেধ করেননি। বিমান এমডি উইং কমান্ডার (অব.) আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাফ এভিয়েশনের সঙ্গে গোপন বৈঠক হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। তার অংশ হিসেবে পরিচালক শাহনেওয়াজ গত বছর এলাফ এভিয়েশনের ম্যানেজার (পাকিস্তানি নাগরিক) নাসির খানকে ভিসা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে চিঠি দেয়। কিন্তু তা জানাজানি হয়ে গেলে বিমানের শীর্ষ ম্যানেজমেন্ট ওই চিঠি বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে নাসির খানকে ভিসা না দেয়ার জন্য দূতাবাসকে জানায়।
জানা গেছে, সিন্ডিকেটের সর্বশেষ বৈঠক হয় দুবাইতে। পরিচালক শাহনেওয়াজ আবুধাবী যাওয়ার নামে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দুবাই গিয়ে ওই বৈঠকে অংশ নেন। আর সৈয়দ আহসান কাজী জেদ্দা থেকে দুবাই গিয়ে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আহসান কাজী জানান, তিনি হজ করে এসেছেন। এ ধরনের কোনো অনিয়ম ও অনৈতিক কাজ তিনি কারও সঙ্গে করেন না। তিনি দুবাইতে কোনো বৈঠকও করেননি বলে জানান। তবে তিনি বলেন, এখন কোনো জিএসএ’র মেয়াদ আর নবায়ন করা হবে না। প্রথম দিকে এটা সিদ্ধান্ত ছিল। এখন সবগুলো টেন্ডারের মাধ্যমে নেয়া হবে। ১ মাস পর মেয়াদ শেষ হচ্ছে, এখন টেন্ডার আহ্বানের সময় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি ম্যানেজমেন্ট দেখবে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কমিশন বাণিজ্য ছাড়া বিমানের কোনো স্টেশনেই জিএসএ নিয়োগ ও মেয়াদ বৃদ্ধি হয় না। প্রতিটি জিএসএ নিয়োগের কমিশন সর্বনিম্ন ১০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত উঠে। সবেচেয়ে বেশি রেট জেদ্দার জিএসএ নিয়োগে। যার কারণে কমিশন দিয়ে নিয়োগ পাওয়ায় প্রথম দিন থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে জিএসএ মালিকরা। এ কারণে অধিকাংশ জিএসএ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে বিমান।
বর্তমানে বিশ্বের ১৮টি দেশে বিমানের বৈদেশিক অফিস বা স্টেশন রয়েছে। অধিকাংশ স্টেশনেই বিমানের জিএসএ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক জায়গায় বিমানের নিজস্ব একাধিক কান্ট্রি ম্যানেজার, স্টেশন ম্যানেজারসহ স্টাফ থাকার পরও জিএসএ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে বর্তমান সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদলের নেতৃত্বে গত সংসদীয় কমিটির একটি টিম বিমানের ৮টি বৈদেশিক অফিস পরিদর্শনে যায়। তাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে দুর্নীতি আর লুটপাটের আরও ভয়াবহ চিত্র।
এর আগে মাস্কাটের আল বাউয়ান ট্রাভেল নামে একটি কোম্পানিকে জিএসএ পাইয়ে দিয়ে সরকারদলীয় দুই প্রভাবশালী সংসদ সদস্য বিমানের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিনকে নানাভাবে চাপ দিয়েছিলেন। তারা জামাল উদ্দিনকে মহাখালি ডিওএইচএসের এক এমপির বাসায় ডেকে নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে এবং আর্মি গলফ ক্লাবে ডেকে নিয়ে টেন্ডার সিডিউল নিতে বাধ্য করে। দু’দফায় টেন্ডার আহ্বান করে তাদের মনোনীত কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়- যা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত গড়ায়। এবারও ওই দুর্নীতবাজ জিএসএ ওমান ট্রাভেল ব্যুরোকে জিএসএ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য কাজ করছে সিন্ডিকেট। বর্তমানে থাকা এই জিএসএটি ওমানে ৩৬ বছর ধরে এক নাগাড়ে আছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমানের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিন জানান, বিমানের জিএসএ নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের ‘আন্ডার হ্যান্ডডিলিং’ হয়ে থাকে। এর নেপথ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আছে। এসব সিন্ডিকেট তাকে নিয়েও নানা কেলেংকারির জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু তার কঠোর হস্তক্ষেপের কারণে তারা কখনোই সফল হতে পারেনি। তিনি বলেন, এসব কারণে আমরা সর্বশেষ বোর্ড মিটিংয়ে (যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন) জিএসএ নিয়োগ বিমান ম্যানেজমেন্টর হাত থেকে বোর্ডের আন্ডারে নিয়ে আসা হয়। একই ভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস আগে টেন্ডার আহ্বানেরও সিদ্ধান্ত হয়।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর


এই বিভাগের আরো খবর