ঢাকা, ১৯ আগস্ট, ২০১৯ || ৩ ভাদ্র ১৪২৬
২৪১

৩৬ ঘন্টার বিচিত্র রুপ!

ইশতিয়াক হুসাইন

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৮  


আজমীর, ভারত থেকে: পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল স্থানীয় সময় দুপুর একটা ১০ মিনিটে। রেলস্টেশনে পৌছা এবং ট্রেনে ওঠার আগ পর্যন্ত বাঙালিদেরই বেশি চোখে পড়লো।   

কিন্তু ট্রেনে টানা ৩৬ ঘন্টার যাত্রায় একে একে বুঝতে পারলাম এটি বাঙালি অধ্যুষিত পশ্চিম বাংলা থেকে ছাড়লেও এর ভেতরে রয়েছে নানা বিচিত্রতা। পথে যেতে যেতে ট্রেনের ভেতর এবং বাইরে এই বিচিত্রতার ঝাঁপি খুলতে লাগলো।  

পশ্চিম বাংলার সমতল এলাকা শেষ না হতেই ট্রেনের জানালার ফাঁক গলিয়ে এলো লালমাটি। ঝাড়খন্দের লালমাটি আর পাহাড়, সেই সঙ্গে ঘন জঙ্গলে খুঁজে পেলাম অন্য রকম একটি পরিবেশ। ট্রেনে আমাদের পাশের আসনের এস প্রকাশ ঝাড়খন্দের মধুপুরের বাসিন্দা। স্ত্রী সন্তান নিয়ে তিনি বেড়াতে যাচ্ছেন রাজস্থানের জয়পুরে।  

তিনি বললেন, উপজাতি অধ্যুষিত ঝাড়খন্দে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চাল ও রুটি। লিট্টি চোখা, পানি পুরি, পিঠা, ঢুসকা, দুধাউরি, কেরা দুধাউরি উল্লেখযোগ্য খাবার। ঢুসকা ঝাড়খান্দের খুবই প্রসিদ্ধ একটি খাবার, যা মূলত খাসির কারি ও আলু দিয়ে তৈরি। শুকনা মাশরুমও এখানকার জনপ্রিয় খাবার। কাঁঠাল, আম ও লিচু এসব খাবারে যোগ করে বাড়তি আনন্দ।   

কিছুদূর পরপর কোথাও লালমাটি, কোথাওবা ঘন জঙ্গলের পাহাড় ঘেরা ঝাড়খন্দের পথ শেষ হতেই প্রবেশ করলাম বিহার রাজ্যে। ৯৪ হাজার ১৬৩ বর্গকিলোমিটারের এই প্রদেশটি পেরোতে সময় লাগলো অনেকক্ষণ। হিন্দির পাশাপাশি উর্দুর ভাষাভাষীর এই রাজ্যকে মাঝখান থেকে আড়াআড়ি দু’ভাগ করেছে গঙ্গা নদী। এখানকার ৮৫ ভাগ মানুষই গ্রামে বসবাস করে। ভারতের ৭১ শতাংশ লিচুর উৎপাদক এই রাজ্যের ২২ শতাংশ মানুষই কৃষক। সমতল ও পাহাড়ের মিশেলের বিহার শেষে এলো উত্তর প্রদেশ। এই এক রাজ্য থেকেই পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। 

কৃষকের জমি চাষ, ফসল তোলা, মহিষ চরানো, সাইকেলে চড়ে নারীর পথ চলা, রাস্তা নির্মাণ, মাছ শিকার, শিশুর ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য চিরায়ত গ্রামের ছবিকেই মনে করিয়ে দেয়। ফসলের মাঠে কাজ করা কৃষকের অনেকেই নারী। এসব নারী শাড়ি পরেই স্বচ্ছন্দে কাজ করছেন।   

টানা ২৪ ঘন্টার ট্রেনে যাত্রার পরদিন দুপুরের দিকে যাত্রাপথে হঠাৎ বিশাল বিশাল লাল রঙের দেয়াল দেখে থমকে গেলাম। পরে জানলাম এটি আগ্রার দূর্গ। মোঘল স¤্রাট আকবরের এই বিশাল দূর্গের অদূরেই রয়েছে স¤্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার অনিন্দ্য নির্দশন তাজমহল। যমুনা নদীর তীর ঘেষেই এই দুটি ঐতিহাসিক জায়গায় বেড়াতে আসা শতশত মানুষের ভিড়।   

একেক প্রদেশের একেক ভৌগলিক বিচিত্রতা যেমন চোখে প্রশান্তি এনে দিল তেমনি বিভিন্ন জাতির, বিভিন্ন ভাষার মানুষের ট্রেনেও ছিল বিষয় বৈচিত্র্য। সকল শ্রেনী পেশার মানুষ অনন্যা এক্সপ্রেসের যাত্রী। মাইলের পর পর মাইল কোথাও পাহাড়, মাইলের পর মাইল কোথাও শুধুই সবুজ, মাইলকে মাইল কোথাও মিলেছে ঘন জঙ্গল। গমের ক্ষেত, ধানক্ষেত ছেয়ে আছে একরের পর একর ফসলি জমি।    

হিন্দু, শিখ, মুসলিম, খ্রিষ্ট্রান, বুদ্ধিষ্ট, জৈনসহ নানা ধর্মের মানুষের বসবাস ভারতে। শুধু ধর্মই নয়, নানা জাতি, নানা ভাষার মানুষেরও আবাসস্থল ৩২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশটি। সেই দেশে তো বিচিত্রতা থাকবেই। এর ব্যতিক্রম নয়, অনন্যা এক্সপ্রেসও। 

অনন্যাতেই পরিচয় হলো প্রসাদ মৈত্র্যের সঙ্গে। বারবার ট্রেনের কামরা পরিস্কার করতে আসছিলেন এই তরুণ। বয়স বড়জোর ২৩/২৪। সারাদিন রাত ধরে কিছু সময় পরপর প্রসাদের আগমন ঘটছে আমাদের কামলায়। ট্রেনটিকে যতটুকু সম্ভব পরিস্কার রাখার জন্যই এই তরুণের দিনান্ত পরিশ্রম। বিহারের বাসিন্দা প্রসাদ ট্রেনের চাকরিতে ঢুকেছেন কয়েকমাস হলো। তার চাকরির এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাটা যেন একটু বেশিই মনে হলো। 

বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক এই দেশটির পূর্ব প্রান্ত থেকে উত্তরাংশ হয়ে পশ্চিমাংশের রাজস্থানের আজমীরে যখন পৌছলাম তখন ৩৬ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে পূর্ণ আমরা।